চলছে ২০২৬-২০২৭ করবর্ষের আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার মৌসুম। অনেক করদাতা প্রতিবছরই আয়কর রিটার্ন জমার সময় বিষয়টিকে শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখেন। অথচ রিটার্নে দেওয়া তথ্যই করদাতার আয়, ব্যয়, বিনিয়োগ, সম্পদ, দায় এবং পরিশোধিত করের হিসাবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা অনেকেই জানেন না কিংবা গুরুত্ব দেন না। তাই দেখা যায়, সামান্য ভুল তথ্য বা এক জায়গার সঙ্গে অন্য জায়গার তথ্যের অসঙ্গতি পরবর্তীতে সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।আয়কর নিয়ে অনেক করদাতাসহ সাধারণ নাগরিকের নানা প্রশ্ন থাকে। অনেকের আয়কর নিয়ে হয়রানি ভয়ের পাশাপাশি পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব আছে। এছাড়া রিটার্ন দেওয়ার সময় কিছু বিষয়ে অবশ্যই সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে, তা না হলে আইনগত ঝামেলায় পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই করদাতাদের বছর শেষে রিটার্ন দেওয়ার আগে জানা প্রয়োজন এমন কিছু বিষয় তুলে ধরা হলো:
রিটার্ন জমা দেওয়া যাবে সারাবছর,
আয়কর ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হিসেবে সারাবছর রিটার্ন দাখিলের সুযোগ চালু করা হয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ের আগে রিটার্ন জমা দিলে করদাতারা বিশেষ প্রণোদনা পাবেন। আবার নির্দিষ্ট সময়ের পর রিটার্ন দাখিল করলে গুনতে হবে জরিমানা।করবর্ষের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) রিটার্ন দিলে পরিশোধযোগ্য করের ৫ শতাংশ বা ২৫ হাজার টাকা, যা কম, তা ছাড় দেওয়া হয়েছে। চলমান দ্বিতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) রিটার্ন দাখিলে যা কর তা দিলেই হবে, কোনো প্রণোদনা পাওয়া যাবে না। আর জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে রিটার্ন দিলে পরিশোধযোগ্য করের ২ শতাংশ বা ৩ হাজার টাকা যেটি বেশি, সেই পরিমাণ টাকা জরিমানা দিতে হবে। এছাড়া এপ্রিল-জুন মাসে রিটার্ন দিলে পরিশোধযোগ্য করের ৫ শতাংশ বা ৫ হাজার টাকা, যেটি বেশি, সেই পরিমাণ টাকা জরিমানা দিতে হবে।
সম্পদের স্বচ্ছ বিবরণ
রিটার্ন দাখিল করার সময় সম্পদের স্বচ্ছ বিবরণ থাকা জরুরি। অন্যথায়, জটিলতা তৈরি হতে পারে। আয়কর রিটার্নে ব্যক্তিগত আয় থেকে শুরু করে স্থাবর-অস্থাবর সব ধরনের সম্পদের তথ্যই সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে। এক রিটার্নে কোনো একটি সম্পদের তথ্য উল্লেখ না থাকলে সেটি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত হিসেবে বিবেচিত হয়, ফলে পরবর্তীতে রিটার্নে সেটি অন্তর্ভুক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।অতএব, আপনার ব্যক্তিগত আয়, ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা, সঞ্চয়পত্র, শেয়ার, ডিবেঞ্চার এবং অন্যান্য স্থাবর সম্পদের বিবরণ আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে।
সহজ ভাষায়, যদি আপনি কোনো সম্পদের বিবরণ রিটার্নে তুলে না ধরেন, তাহলে সেটি বৈধ থাকবে না এবং আপনি আইনগত ঝামেলায় পড়তে পারেন। সম্পদের স্বচ্ছ বিবরণ না দিয়ে অনেকে বড় ধরনের ভুল করেন। সেক্ষেত্রে সম্পদ গোপনের অভিযোগে পরবর্তীতে আয়করদাতাকে নানা ধরনের আইনগত ঝামেলা পোহাতে হতে পারে।ধরা যাক, কারও ১ কোটি টাকা মূল্যের শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ আছে; কিন্তু তিনি সেটা রিটার্ন দাখিলের সময় দেখালেন না। যদি তদন্তের মাধ্যমে এটি বেরিয়ে আসে, তাহলে আয়কর বিভাগ প্রশ্ন করতে পারে, কেন এটা লুকানো হলো? এ প্রশ্নের জবাব দিয়ে বের হয়ে আসা সহজ নয়।
আয়-ব্যয়ের অঙ্কে সঙ্গতি
আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় আয়ের বিপরীতে ব্যয়ের অঙ্কে সঙ্গতি থাকা উচিত। কারও আয় হিসেবে যে অঙ্ক উল্লেখ করা হয়, খরচের জায়গায়ও তার প্রতিফলন থাকা উচিত। তাই আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় আপনি আয় যেমন দেখাবেন, তেমনি ব্যয়ও দেখাবেন। আয়ের সাথে ব্যয়ের সামঞ্জস্য থাকাটা জরুরি। আপনার জীবনযাত্রার ব্যয় আয়ের সাথে যদি সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে আপনি আইনগত ঝামেলায় পড়তে পারেন।
পেপারওয়ার্ক রেডি করে তবেই অনলাইন রিটার্ন
পেপারওয়ার্ক রেডি করার পরেই অনলাইন রিটার্নের ডেটা এন্ট্রি করা উচিত। যেমন চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে বেতন বাবদ উপার্জনের নথি, ভাড়ার রসিদ ও চুক্তিপত্র, স্থানীয় পর্যায়ে করের রসিদ, সম্পদ ক্রয়-বিক্রয়ের দলিল, উৎসে কর কর্তনের সনদ, ব্যাংক হিসাবের বিবরণ ইত্যাদি অনলাইন রিটার্ন দাখিলের আগেই হাতে থাকা উচিত। কারণ, পেপারওয়ার্ক ছাড়া আপনি হয়ত অনলাইন রিটার্নের ডেটা এন্ট্রি করে ফেলতে পারবেন, কিন্তু পরবর্তীতে একটি তথ্যের গড়মিল হলেও তার জন্য করদাতাকে জবাবদিহি করতে হবে। তাই আয়কর রিটার্ন দাখিলের আগে আয়, ব্যয়, সম্পদ, দায় ও কর পরিশোধসংক্রান্ত সব তথ্য ও প্রমাণপত্র ভালোভাবে মিলিয়ে নেওয়া উচিত। ভবিষ্যতে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা এড়ানোর জন্য এগুলোর বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
প্রথমবার রিটার্নের ক্ষেত্রে সতর্কতা
যারা প্রথমবার রিটার্ন জমা দিচ্ছেন, তারা অনলাইন রিটার্নের ডেটা এন্ট্রির ক্ষেত্রে সতর্ক থাকুন। সম্পদের বিবরণ দাখিলের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ থাকুন। কোনো কিছু লুকানোর চেষ্টা করবেন না। অনেকে মনে করেন, প্রথমবার সব সম্পত্তির বিবরণ না দিয়ে ধাপে ধাপে প্রতিবছর সেগুলো দেখানো হবে—এটি একটি ভুল ধারণা। বিষয়টি যদি আয়কর কর্তৃপক্ষের নজরে আসে, তাহলে আপনি আইনগত ঝামেলায় পড়তে পারেন। রিটার্ন দাখিলের কয়েক বছর পরও একটি ফাইল অডিটের জন্য নির্বাচন করা হতে পারে; সেক্ষেত্রে তথ্যের গরমিল পাওয়া গেলে বড় অঙ্কের জরিমানা হতে পারে।এবার আলোচনা করা যাক আয়কর রিটার্নের সাধারণ কিছু ভুল নিয়ে, যা থেকে গেলে পরবর্তীতে কর নির্ধারণে সমস্যা বা অপ্রয়োজনীয় জটিলতা দেখা দিতে পারে। আয়কর রিটার্নের ক্ষেত্রে যেসব ভুল সাধারণত বেশি দেখা যায়, তা নিচে তুলে ধরা হলো:
১. মাঝেমধ্যেই মোট আয়ের তুলনায় খরচ বেশি দেখানো হয়, যা আর্থিক তথ্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এতে আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
২. আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ না হলে অস্বাভাবিক নগদ অর্থ দেখানো উচিত নয়; কিন্তু হাতে নগদ অর্থ অস্বাভাবিক বা অতিরিক্ত পরিমাণে দেখান অনেকেই।
৩. অনেক সময় সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা অন্য কোনো এলাকায় অবস্থিত ফ্ল্যাট, জমিসহ স্থাবর সম্পত্তি সঠিকভাবে উল্লেখ করা হয় না। এতে করদাতার সম্পদের প্রকৃত চিত্র উঠে আসে না।
৪. স্বর্ণালংকারের পরিমাণ ভুলভাবে দেখানো হয় অনেক সময়। সেই সম্পদ রাখার মতো আয় আপনার আছে কি না, তাও ভাবতে হবে।
৫. এফডিআর, ডিপিএস, সঞ্চয়পত্রসহ অন্যান্য আর্থিক সঞ্চয় বা বিনিয়োগের তথ্য উল্লেখ না করা।
৬. ঋণ দেওয়া বা ঋণ নেওয়ার তথ্য সম্পূর্ণভাবে উল্লেখ করা হয় না। রিটার্নে ঋণের তথ্যও দিতে হবে; তা না হলে এই অর্থ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
৭. অনেকে একই আয়বর্ষে একাধিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের তথ্য দেন বা মোট আয় ভুলভাবে বসান। এনবিআরের ২০২৬ সালের এফএকিউ অনুযায়ী, অনলাইন রিটার্নে ডেটা এন্ট্রির সময় একাধিক চাকরির তথ্য ও আয় আলাদাভাবে যোগ করা যায়। একইভাবে চিকিৎসক বা আইনজীবীদের মতো পেশাজীবীদের আয়ও সঠিক খাতে দেখানো গুরুত্বপূর্ণ। এনবিআর তাদের পেশাগত আয় বিজনেস/প্রফেশনাল ইনকাম -সংক্রান্ত নির্দিষ্ট অংশে দেখানোর নির্দেশনা দিয়েছে।
