ইসলামি ধারার পাঁচ ব্যাংকের একীভূত কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। পাশাপাশি তিনি এ–ও জানিয়েছেন, নামমাত্র শর্তে পুরোনো মালিকদের ফেরার সুযোগ দেওয়া হবে না।
ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে গভর্নর এই আশ্বাস দেন। আজ সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে ব্যাংক উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, ‘সংশোধিত আইনের ধারায় যাঁরা ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে গেছেন তাঁদের ফেরার সুযোগ রাখা হয়েছে, এ নিয়ে আমরা ভয়ে আছি। যাঁরা অতীতে ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাঁরা আবার ফিরে এলে ব্যাংক খাতে নতুন করে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে।’
বিএবির সভাপতি ও ঢাকা ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার বৈঠক শেষে বলেন, ‘কারা ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে গেছে, তা সাধারণ মানুষও জানে। তাই তাদের ফেরার সুযোগ দেওয়া হলে ব্যাংক খাতের প্রতি জনগণের আস্থা আরও কমে যাবে। এতে নতুন করে সংকট সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সরকারের আরও গভীরভাবে ভাবা উচিত।’
* পাঁচ ব্যাংক একীভূতকরণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে: গভর্নর * ব্যাংক খাত ইতিহাসের অন্যতম চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছে: বিএবি
আবদুল হাই সরকার জানান, বৈঠকে গভর্নর তাঁদের আশ্বস্ত করেছেন যে সংশোধিত আইনের ১৮(ক) ধারার শর্ত পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করলে সাবেক মালিকদের ফেরার সুযোগ হবে না। একই সঙ্গে পাঁচটি ব্যাংকের চলমান একীভূতকরণ প্রক্রিয়াও অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন গভর্নর।
আবদুল হাই সরকার আরও বলেন, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা প্রণয়নের আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত ছিল। তাহলে সিদ্ধান্তগুলো আরও গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর হতো।
বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি ও শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক এ কে আজাদ, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) চেয়ারম্যান শরীফ জহির, পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মনজুরুর রহমান এবং ব্যাংক এশিয়ার চেয়ারম্যান রোমো রউফ চৌধুরী।
সভায় বিএবির পক্ষ থেকে একটি লিখিত প্রস্তাব দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে ইতিহাসের অন্যতম চ্যালেঞ্জিং সময় অতিবাহিত করছে। একদিকে খেলাপি ঋণের পাহাড়, অন্যদিকে মূলধন ও নিরাপত্তা সঞ্চিতির ঘাটতির তীব্র চাপ। এই টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যেই ‘ব্যাংক রেজোল্যুশন (সংশোধিত) আইন’ এবং এর বিশেষ কিছু ধারা নিয়ে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে ব্যাংক উদ্যোক্তাদের মধ্যে।
বিশেষ করে, যাঁরা একসময় ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ বা ‘লুটপাট’ করে চলে গেছেন, আইনি ফাঁকফোকরে তাঁদের আবার মালিকানায় ফেরার সুযোগ থাকা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ব্যাংকমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)।
বিএবি বলেছে, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো বাংলাদেশের আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এমন সময়ে জবাবদিহির দুর্বলতা প্রকাশ পেলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ব্যাংকিং খাতের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিএবি গভর্নরকে দেওয়া চিঠিতে ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ও সংস্কার প্রস্তাব পেশ করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে—উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ নিষ্পত্তির জন্য মালয়েশিয়া বা দক্ষিণ কোরিয়ার আদলে একটি পেশাদার ‘জাতীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি’ প্রতিষ্ঠা এবং অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধন করে স্থগিতাদেশের অপব্যবহার রোধ এবং ফাস্ট-ট্র্যাক রিকভারি বেঞ্চ চালু।
সংগঠনটি সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উৎসাহ বোনাস বন্ধ না করার অনুরোধ জানিয়েছে, যাতে দক্ষ জনবল ধরে রাখা সম্ভব হয়। ব্যাসেল-৩ অনুযায়ী মূলধন পর্যাপ্ততা বজায় রাখতে স্টক লভ্যাংশের ওপর অতিরিক্ত কর থেকে অব্যাহতি দাবি করেছে। পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় থাকা ব্যাংকগুলোকে সরাসরি ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে না পাঠিয়ে একটি বিশেষ ‘ট্রান্সফরমেশন ক্যাটাগরি’তে রাখার প্রস্তাব দিয়েছে বিএবি।

