কর ফাঁকি শনাক্ত ও রাজস্ব আদায় বাড়াতে, করদাতাদের ঘোষিত আয়ের সঙ্গে তাদের প্রকৃত আয়-ব্যয় ও অর্জিত সম্পদের মধ্যে সামঞ্জস্যহীনতা খুঁজে বের করতে এক ডেটাভিত্তিক বা উপাত্তনির্ভর সমন্বিত ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।এই ব্যবস্থার অধীনে, প্রতিটি করদাতার একটি ইন্টিগ্রেটেড বা সমন্বিত প্রোফাইল তৈরি করা হবে। এতে করদাতার আয়কর রিটার্নে ঘোষিত আয়ের সঙ্গে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে খরচ, বিদেশ ভ্রমণ, ব্যাংক লেনদেন, গাড়ি ক্রয়, শেয়ারবাজারের বিনিয়োগ এবং অন্যান্য স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির ক্রয়-বিক্রয় বা ব্যবহারের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিলিয়ে দেখা হবে।নতুন এই প্রযুক্তি করদাতার আয়, ব্যয় ও সম্পদের মধ্যে সংগতি রয়েছে কি না তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মূল্যায়ন করবে। যদি এতে বড় ধরনের কোনো গরমিল পাওয়া যায়, তবে সংশ্লিষ্ট করদাতাকে উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ (হাই-রিস্ক) ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।এনবিআর আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে করদাতাদের এই সমন্বিত প্রোফাইল সম্পন্ন করা এবং একটি শক্তিশালী 'ইনকাম ট্যাক্স ডেটা ওয়্যারহাউস' স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে। এর পাশাপাশি উচ্চ সম্পদসম্পন্ন ব্যক্তির (হাই-নেট-ওয়ার্থ ইন্ডিভিজ্যুয়াল) অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে তাঁদের কর প্রদানের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা যাচাই করতে তাঁদের পৃথক প্রোফাইল তৈরি করা হবে।
গতকাল অর্থমন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে, এ পরিকল্পনাসহ রাজস্ব আয় বাড়াতে এনবিআরের আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস বিভাগ থেকে পৃথক পৃথক পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন কর্মকর্তারা। বৈঠকের কার্যপত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।বৈঠকে আগামী তিন মাস থেকে শুরু করে পরবর্তী পাঁচ বছর পর্যন্ত মোট ছয় মেয়াদের সময়সীমা নির্ধারণ করে নিজ নিজ কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করে এনবিআরের বিভাগগুলো।গত অর্থবছর ৪ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ করেছে এনবিআর। চলতি অর্থবছর সংস্থাটির জন্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করেছে বিএনপি সরকার।উপস্থাপিত কর্মপরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বিদ্যমান ৬.৮ শতাংশ থেকে স্বল্পমেয়াদে আরও দুই শতাংশ পয়েন্ট বাড়ানো, মধ্যমেয়াদে এটি ১০ শতাংশে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে উন্নীত করা।
অর্থপাচার রোধে বিদেশে কাস্টমস অ্যাটাশে পদ তৈরির প্রস্তাব
বাণিজ্যিক জালিয়াতি, রাজস্ব ফাঁকি এবং বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচার (ট্রেড মিস-ইনভয়েসিং) রুখতে প্রধান প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার দেশগুলোতে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোতে কাস্টমস অ্যাটাশে পদ তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে এনবিআর।সংস্থাটি জানিয়েছে, কেবল দেশীয় উপাত্ত দিয়ে এ ধরনের ঝুঁকি শনাক্ত করা সম্ভব নয়। ফলে প্রস্তাবিত কাস্টমস অ্যাটাশেরা আমদানিকৃত পণ্যের উৎস, রপ্তানিকারকের বিস্তারিত পরিচয়, বাণিজ্যিক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট বিদেশি কোম্পানি সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি বন্ধে ভূমিকা রাখবেন।
করদাতার প্রোফাইলে যেসব তথ্য থাকবে
করদাতার অটোমেটেড আয় ও সম্পদ প্রোফাইলে যেসব তথ্য থাকবে, তার মধ্যে- ঘোষিত আয় ও আয়করের পরিমাণ, ব্যাংক লেনদেন, স্থাবর সম্পত্তি, কোম্পানির মালিকানা, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ, আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ, উইথহোল্ডিং ট্যাক্স, বিদেশ ভ্রমণের তথ্য, ব্যাংক হিসাব ও বড় অংকের লেনদেন, বাড়ি-জমি ও ফ্ল্যাট ক্রয়-বিক্রয়, গাড়ির মালিকানা, উচ্চ মূল্যের ইউটিলিটি কানেকশন, ভাড়া থেকে আয় এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে ব্যয়।উদাহরণ হিসেবে এনবিআর বলেছে, কোন করদাতার ঘোষিত আয়ের পরিমাণ ১২ লাখ টাকা, কিন্তু তার ব্যাংকে জমা আছে ১.২০ কোটি টাকা, গাড়ি ক্রয় ৫০ লাখ টাকা, জমি ক্রয় ১ কোটি টাকা এবং বিদেশ ভ্রমণ বছরে ৫ বার। এ ধরণের অসঙ্গতি ন্যাশনাল ইনকাম ট্যাক্স ডেটা ম্যাচিং সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিহ্নিত করবে। এতে ডেটাভিত্তিক এনফোর্সমেন্ট সম্ভব হবে।
কর্পোরেট আয়কর ফাঁকি রোধের উপায়
কর্পোরেট আয়কর ফাঁকি বন্ধ করতে নির্দিষ্ট কিছু আর্থিক সূচক সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনার জন্য একটি সিস্টেম-ভিত্তিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামোর প্রস্তাব করা হয়েছে।এর মধ্যে থাকবে কোম্পানির টার্নওভার বনাম ঘোষিত মুনাফা, গ্রস প্রফিট রেশিও, রিলেটেড-পার্টি ট্রান্সজেকশনস, সুদের খরচ, ব্যবস্থাপক ফি, রয়্যালটি, কমিশন, অবচয়, মন্দঋণ, রিলেটেড-পার্টি লোন, পরিচালকদের সম্মানী, আমদানিকৃত পণ্যের মূল্যের বিপরীতে স্থানীয় বাজারে বিক্রি, ভ্যাট টার্নওভার বনাম আয়কর টার্নওভার।কর্পোরেট আয়কর ফাঁকি কমাতে একই খাতের কোম্পানিগুলোর জন্য ইন্ডাস্ট্রি বেঞ্চমার্ক তৈরির কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে বলে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে জানিয়েছে এনবিআর।

