করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো উচিত ছিলকর-ভ্যাটের চাপ আরও বাড়বেবাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় ৩০ পণ্যে কমছে করভোগ্য পণ্যে শুল্ক কমানোর পরামর্শনতুন করের বোঝা না চাপানোর অনুরোধ ডিএসই’র
No icon

২০২২-২৩ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে সবচেয়ে কম প্রবৃদ্ধি অর্জন

শুল্ক-কর আদায়ে প্রবৃদ্ধি কমে এক অঙ্কের ঘরে নেমে গেছে। সরকারি সংস্থা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) গত এক দশকের মধ্যে সদ্য বিদায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে আগের অর্থবছরের তুলনায় সবচেয়ে কম প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। প্রবৃদ্ধির হার মাত্র ৮ দশমিক ১২ শতাংশ, যা এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম। তবে কোভিড মহামারি শুরুর প্রথম বছরেও লকডাউনের কারণে তিন মাসের মতো সবকিছু বন্ধ থাকায় রাজস্ব আদায় আগের অর্থবছরের চেয়ে কমে গিয়েছিল।

এনবিআরের প্রবৃদ্ধি এত কমল যখন রাজস্ব আদায় বাড়াতে সবচেয়ে চাপে আছে সংস্থাটি। একদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত পূরণে বাড়তি রাজস্ব আদায়ের চাপ, অন্যদিকে সরকারের বাজেটে খরচ বৃদ্ধির জোগান বাড়াতে ধারাবাহিক চাপ। প্রতিবছরই এনবিআরকে বাড়তি রাজস্ব জোগানের জন্য বিশাল লক্ষ্য দেওয়া হয়। 

এনবিআরের তথ্যানুযায়ী, ২০১৩-১৪ অর্থবছর থেকে পরের পাঁচ বছর শুল্ক-কর আদায়ে প্রবৃদ্ধি পৌনে ১১ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে ছিল। 

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান প্রথম আলোকে বলেন, ‘কোভিডের সময় নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির পর রাজস্ব আদায়ে বড় উল্লম্ফন হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। এনবিআর এখন রেসের পুরোনো ঘোড়ার মতো হয়ে গেছে। এখন শক্তিশালী ঘোড়া দরকার। বড় ধরনের সংস্কার করেই এনবিআরকে শক্তিশালী ঘোড়ায় পরিণত করতে হবে।

কত আদায় হলো

সদ্য বিদায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরে সব মিলিয়ে ৩ লাখ ২৫ হাজার ২৭২ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করেছে এনবিআর। এটি সংস্থাটির সাময়িক হিসাব, যা চূড়ান্ত হিসাবে কিছু কমবেশি হতে পারে। এই অর্থবছরে এনবিআরকে শুল্ক-কর আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা, যা এর আগের অর্থবছরের চেয়ে ২৫ শতাংশ বেশি। কিন্তু বাস্তবে এত প্রবৃদ্ধি তো হয়ইনি, উল্টো এক দশকের মধ্যে কম প্রবৃদ্ধি হয়েছে। লক্ষ্য থেকে ঘাটতি হয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। আইএমএফ রাজস্ব আদায়ের জন্য ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার একটি লক্ষ্য দিয়েছিল; সেটিও অর্জিত হয়নি। এর মধ্যে চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নিয়মিত প্রবৃদ্ধির সঙ্গে জিডিপির প্রায় আধা শতাংশের সমান বাড়তি শুল্ক-কর আদায়ের শর্ত আরোপ করেছে আইএমএফ। 

এনবিআরের সাময়িক হিসাবে দেখা গেছে, আয়কর ও শুল্ক আদায়ে প্রবৃদ্ধি এক অঙ্কের ঘরে নেমেছে। আয়কর ও ভ্রমণ কর আদায়ের লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ২২ হাজার ১০০ কোটি টাকা, এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৯২১ কোটি টাকা। এ খাতে প্রবৃদ্ধি মাত্র ৯ দশমিক ৬২ শতাংশ। শুল্ক খাতে ১ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৯১ হাজার ৭১৭ কোটি টাকা। এতে প্রবৃদ্ধি মাত্র ২ দশমিক ৫৬ শতাংশ।

তবে ভালো করেছে ভ্যাট খাত। এ খাতে প্রবৃদ্ধি মন্দের ভালো। আগের বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১ দশমিক ২৭ শতাংশ। যদিও ১ লাখ ৩৬ হাজার ৯০০ কোটি টাকার লক্ষ্যের বিপরীতে আদায় হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা।

এ নিয়ে সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, এনবিআরকে প্রতিবছর তার সক্ষমতার চেয়ে বেশি লক্ষ্য চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যমান করকাঠামো দিয়ে আইএমএফের শর্ত পূরণ এবং বিশাল লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। বড় লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করতে গিয়ে যারা কর দেয়, তাদের ওপর বাড়তি কর আদায়ের কৌশল নেয় এনবিআর।

এনবিআরের কর্মকর্তারা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং দেশে ডলার সংকটের কারণে সরকার কৃচ্ছ্র সাধনের উদ্যোগ নিয়েছে। এতে আমদানি কমেছে, যার প্রভাব পড়েছে আয়কর ও ভ্যাট আদায়ে।

জিডিপি বেড়েছে চার গুণ, রাজস্ব দ্বিগুণও হয়নি

গত এক দশকে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বেড়েছে চার গুণ। কিন্তু শুল্ক কর আদায় দ্বিগুণও হয়নি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী ২০১৩-১৪ অর্থবছরে জিডিপির আকার ছিল ৭ লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়েছে দাঁড়িয়েছে ৩২ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে অর্থনীতি বড় হওয়ার পুরো সুফল ঘরে তুলতে পারেনি এনবিআর। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সব মিলিয়ে ১ লাখ ৮৫ হাজার ৩ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করেছিল এনবিআর। ১০ বছরে তা বেড়ে সোয়া ৩ লাখ কোটি টাকা হয়েছে।