
নতুন অর্থবছরেও প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত দেশে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে মোট ১১৫ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। গত বছরের একই সময় দেশে এসেছিল ১০৩ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার। ফলে বছরের ব্যবধানে রেমিট্যান্স প্রবাহে ১১.৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
রোববার (১২ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ তথ্য নিশ্চিত করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৯ থেকে ১১ জুলাই—এই তিন দিনেই দেশে এসেছে ১৯ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। এতে মাসের প্রথম আট দিনের তুলনায় রেমিট্যান্সের গতি আরও জোরালো হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নতুন অর্থবছরের শুরুতে রেমিট্যান্সের এই ইতিবাচক প্রবণতা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারকে আরও স্থিতিশীল করতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় পরিশোধ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা এবং টাকার বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স দীর্ঘদিন ধরেই অন্যতম প্রধান বৈদেশিক মুদ্রার উৎস। তৈরি পোশাক রপ্তানির পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থ দেশের চলতি হিসাবের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ডলারের সংকট এবং আমদানি ব্যয়ের চাপের মধ্যে রেমিট্যান্স অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন উদ্যোগের কারণে বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বেড়েছে। ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে দ্রুত অর্থ পৌঁছে দেওয়া, প্রণোদনা সুবিধা, ডিজিটাল লেনদেনের সম্প্রসারণ এবং হুন্ডি কার্যক্রমের বিরুদ্ধে নজরদারি বৃদ্ধির ফলে প্রবাসীদের একটি বড় অংশ এখন আনুষ্ঠানিক চ্যানেল ব্যবহার করছেন।
মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা দেশের অর্থনীতিতে নিয়মিত বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাচ্ছেন। শ্রমবাজার সম্প্রসারণ এবং নতুন কর্মী বিদেশে যাওয়ার প্রবণতাও দীর্ঘমেয়াদে রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু রেমিট্যান্সের পরিমাণ বাড়লেই হবে না; এই অর্থ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ নিশ্চিত করাও জরুরি। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ যদি শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, কৃষি এবং অবকাঠামো উন্নয়নে আরও বেশি ব্যবহৃত হয়, তাহলে তা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বহুগুণ ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ব্যাংকাররা বলছেন, বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে। রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স প্রবাহ একসঙ্গে শক্তিশালী থাকলে ব্যাংকগুলোর ডলার ব্যবস্থাপনায় চাপ আরও কমবে। এতে এলসি নিষ্পত্তি, জ্বালানি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন অর্থবছরের শুরুতে দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর প্রণোদনা অব্যাহত রাখতে হবে। একই সঙ্গে বিদেশে কর্মসংস্থানের নতুন বাজার সৃষ্টি, দক্ষ কর্মী পাঠানো এবং প্রবাসীদের জন্য ব্যাংকিং সেবা আরও সহজ ও প্রযুক্তিনির্ভর করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বরাবরই বলে আসছেন, বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে রেমিট্যান্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রবাসীদের বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন ব্যাংককে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি প্রবাসীদের জন্য দ্রুত ও নিরাপদ অর্থ স্থানান্তর ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে।