
তামাক, সিগারেট ও অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয়ের ওপর কার্যকর ‘সিন-ট্যাক্স’ বা পাপ-কর আরোপ করতে হবে। সেই সঙ্গে ই-সিগারেট পুরোপুরি নিষিদ্ধের জোরালো দাবি উঠেছে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত এক প্রাক-বাজেট সংলাপে। আলোচকদের মতে, রাজস্ব ঘাটতি মোকাবেলা ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কর কাঠামোয় মৌলিক সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
গতকাল রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত ‘রেভিনিউ মোবিলাইজেশন: চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড অপরচুনিটিজ’ শীর্ষক সংলাপে সভাপতিত্ব করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রহমান খান।
সংলাপে ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানান, কর সংস্কারকে শুধু কারিগরি বিষয় হিসেবে দেখার কারণে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ‘লো-লেভেল ইকুইলিব্রিয়াম ট্র্যাপে’ আটকে রয়েছে। তার ভাষায়, ‘রাজস্ব আদায়ের ভিত্তি মূলত রাজনৈতিক। জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের সামাজিক চুক্তি ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া কার্যকর কর সংস্কার সম্ভব নয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘প্রতিনিধিত্ব, জবাবদিহিতা ও রাজনৈতিক বৈধতা ছাড়া কর সংস্কার সফল হতে পারে না। পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক সংস্কৃতি কর ব্যবস্থার সততা দুর্বল করেছে। নাগরিকদের আস্থা পুনর্গঠনে ডিজিটাইজেশন, ক্যাশলেস লেনদেন আধুনিক কর প্রশাসনের অপরিহার্য উপাদান।’
সংলাপে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকসের পরিচালক অধ্যাপক শফিউন নাহিন শিমুল ফিলিপাইনের সিন-ট্যাক্স সংস্কারের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, ‘২০১২ সালে দেশটিতে এ ধরনের কর সংস্কারের ফলে মাত্র এক বছরে রাজস্ব আয় ১০০ শতাংশ বেড়েছিল। পরবর্তী সময়ে ওই আয়ের ৮০ শতাংশ সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় করা হয়।’
তিনি জানান, বাংলাদেশে সিগারেটের বাজারমূল্যের কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা গেলে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আহরণ সম্ভব। তিনি বলেন, ‘আমাদের সিমুলেশন বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শক্তিশালী তামাক কর সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশ সম্ভাব্য প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব অর্জন করতে পারে।’
সংলাপে পিপিআরসি চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান ই-সিগারেট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘ই-সিগারেট থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব অত্যন্ত নগণ্য, কিন্তু এর সামাজিক ঝুঁকি অনেক বেশি। পরিস্থিতি এমন হতে পারে যে তরুণরা শ্রেণীকক্ষেই এটি ব্যবহার করবে।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘কেবল রাজস্বের যুক্তিতে ই-সিগারেটের মতো ক্ষতিকর পণ্যকে ছাড় দিলে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় সামাজিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।’
এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রহমান খান রাজস্ব প্রশাসনের ডিজিটাইজেশন ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে বলেন, ‘বাজারে আসার আগেই সব তামাকজাত পণ্য উৎপাদন গণনাযন্ত্রের মাধ্যমে কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা হবে।’
বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি ও এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘কর ব্যবস্থায় আস্থা ও প্রণোদনার কাঠামো পরিবর্তন ছাড়া করের আওতা বাড়ানো সম্ভব নয়। ভালো করদাতাদের জন্য কমপ্লায়েন্স সুবিধা এবং ধারাবাহিক অ-কমপ্লায়েন্সের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে।’
সংলাপে আরো বক্তব্য দেন পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার, ব্যাংকার মামুন রশীদ, ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান সিমীন রহমান। এছাড়া ছিলেন পিকেএসএফের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার ড. একেএম নুরুজ্জামান, বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক, এফবিসিসিআই পরিচালক আব্দুল হকসহ অনেকে।