TAXNEWSBD
শুল্ক কমানোর সুফল ভোক্তারা পাচ্ছেন কি না, তা যাচাইয়ে ট্যারিফ কমিশনকে এনবিআরের নির্দেশ
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৬:৪৮ অপরাহ্ন
TAXNEWSBD

TAXNEWSBD

আমদানি করা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, ওষুধ, ইলেকট্রনিকসসহ বিভিন্ন পণ্যে শুল্ক ও কর কমানোর সুফল ভোক্তারা পাচ্ছেন, নাকি মূলত ব্যবসায়ীরাই লাভবান হচ্ছেন—তা যাচাই করতে উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।গত ১৮ অক্টোবর বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনকে (বিটিটিসি) দেওয়া এক চিঠিতে এনবিআর জানতে চেয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ১৮টি পণ্যের আমদানি শুল্ক ও কর কমানোর ফলে বাজারে এসব পণ্যের দাম কতটা কমেছে এবং ভোক্তারা কতটুকু সুবিধা পেয়েছেন।বিটিটিসির চেয়ারম্যান নাসির-উদ-দৌলা টিবিএসকে বলেন, তারা এনবিআরের চিঠি পেয়েছেন এবং যত দ্রুত সম্ভব এ বিষয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেবেন।বাংলাদেশে আমদানি শুল্ক প্রতিবেশী ও সমপর্যায়ের দেশগুলোর তুলনায় বেশি বলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন ভোক্তারা। তাদের অভিযোগ, সরকার বিভিন্ন পণ্যে শুল্ক ও কর কমালেও ব্যবসায়ীরা অনেক সময় সেই সুবিধা ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে না দিয়ে নিজেরাই লাভবান হন।

গত অর্থবছরের বাজেটে ভোক্তাদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ বেশ কিছু পণ্যের আমদানি শুল্ক ও কর কমিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ১৮ ধরনের পণ্যে দেওয়া শুল্ক ও কর ছাড়ের সুফল ভোক্তাদের কাছে পৌঁছেছে কি না, তা জানতে চেয়ে চিঠি দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস বিভাগ। পাশাপাশি ভ্যাট বিভাগ থেকেও এ বিষয়ে পৃথক বিশ্লেষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) চেয়ারম্যান এ এইচ এম সফিকুজ্জামান টিবিএসকে বলেন, বাংলাদেশে এমনিতেই অন্যান্য দেশের তুলনায় শুল্কহার অনেক বেশি। মাঝেমধ্যে কিছু পণ্যে শুল্ক কমানো হলেও ভোক্তা পর্যায়ে এর সুফল তেমন একটা পৌঁছায় না।এ জন্য অসাধু ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি সময়মতো শুল্ক না কমানো এবং এনবিআরের যথাযথ নজরদারির অভাবকে দায়ী করেন তিনি।নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, শুল্ক ও কর ছাড় মূলত ভোক্তাদের সুবিধার কথা বিবেচনা করেই দেওয়া হয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, সেই সুবিধা ভোক্তাদের কাছে পৌঁছায় না।

তিনি বলেন, সরকার ব্যবসায়ীদের সুবিধা দেওয়ার জন্য রাজস্ব ছাড় দেয় না। আমরা কয়েকটি পণ্যের তালিকা তৈরি করে জানতে চেয়েছি, এসব ছাড়ের সুফল কারা কতটুকু পেয়েছেন।এই মূল্যায়ন সম্পন্ন হলে ভবিষ্যতে শুল্ক ও করসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে বলে জানান তিনি।এর আগেও এনবিআরের একাধিক চেয়ারম্যান শুল্ক ছাড়ের সুফল ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।যে ১৮ ধরনের পণ্যে শুল্ক ও কর কমানোর প্রভাব মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে কম্পোজিট পেপার, কীটনাশক, খেজুর, মসলা, ডায়ালাইসিস যন্ত্রাংশ, বিভিন্ন ধরনের ওষুধ ও ওষুধের কাঁচামাল, কম্পিউটার ও এর যন্ত্রাংশ, পয়েন্ট অব সেলস (পিওএস) মেশিন, বৈদ্যুতিক চার্জার ও চার্জিং স্টেশন, বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং কাপড়সহ বিভিন্ন পণ্য।অভিযোগ রয়েছে, ব্যবসায়ীরা অনেক সময় ট্যারিফ কমিশন ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে বিভ্রান্ত করে শুল্ক সুবিধা আদায় করেন। কিন্তু পরে নানা কারণ দেখিয়ে সেই সুবিধা ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেন না।

সাধারণত এ ধরনের শুল্ক সুবিধা পেতে ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনের প্রয়োজন হয়। অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো কর্মকর্তা অনৈতিক সুবিধা নিয়ে নির্দিষ্ট খাতের পক্ষে এনবিআরে প্রতিবেদন পাঠান এবং তদবির করেন।তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ট্যারিফ কমিশনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, শুল্ক কমালেই যে পণ্যের দাম কমবে, সব সময় তা নয়।এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, দেখা গেল, শুল্ক কমানো হলেও একই সময়ে আমদানিতে ডলারের বিনিময় হার বেড়ে গেছে। আবার স্থানীয় পর্যায়ে পরিবহন বা সরবরাহ ব্যয়ও বাড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে শুল্ক কমানোর পরও পণ্যের দাম না-ও কমতে পারে।তিনি বলেন, হয়তো শুল্ক না কমালে পণ্যের দাম আরও বাড়ত।বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে ট্যারিফ কমিশনের মূল্যায়নের সুযোগ সীমিত। যেমন ওষুধ ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের শুল্ক ছাড়সংক্রান্ত প্রস্তাব ট্যারিফ কমিশন থেকে দেওয়া হয়নি।

ওষুধের কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশে শুল্ক কমলেও ভোক্তা পর্যায়ে প্রভাব নেই

সাভারের গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের পরিচালক ডা. মহিব উল্লাহ খন্দকার টিবিএসকে বলেন, ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে আগে ৫ থেকে ৭ শতাংশ কর দিতে হলেও আমদানিকারকেরা পরে তা রেয়াত হিসেবে ফেরত পেতেন। ফলে এ কর ছাড়ের কারণে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা রোগীরা উল্লেখযোগ্য কোনো সুবিধা পাচ্ছেন না।তিনি জানান, বাজেটে এ কর ছাড় দেওয়ার পরও এখন পর্যন্ত রোগীদের ডায়ালাইসিসের খরচে কোনো প্রভাব পড়েনি।তবে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ডায়ালাইজার কেনার সময় আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করা হলে রোগীরা সরাসরি উপকৃত হবেন বলে মনে করেন তিনি।ডা. মহিব উল্লাহ বলেন, বর্তমানে একটি ডায়ালাইজারের দাম প্রায় ৮০০ টাকা। ভ্যাট প্রত্যাহার করা হলে এর দাম প্রায় ১০০ টাকা কমতে পারে। পাশাপাশি ডায়ালাইজারের ওপর কর উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো গেলে রোগীদের চিকিৎসাব্যয় আরও কমবে।বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির (বিএপিআই) মহাসচিব ও হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান টিবিএসকে বলেন, ওষুধশিল্পের নতুন ১৭টি কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক সুবিধা দেওয়া হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো উপকৃত হতে পারে।

তবে এর প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে কোন কাঁচামাল আগে সুবিধার বাইরে ছিল, নতুন সিদ্ধান্তে কতটা শুল্ক কমেছে এবং উৎপাদন ব্যয়ে তার কী প্রভাব পড়েছে, তার ওপর।অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ৫৩টি নতুন কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও কর ছাড়ের বিষয়ে তিনি বলেন, এপিআই খাতে আগে থেকেই শুল্ক সুবিধা ছিল। ফলে নতুন সিদ্ধান্তে ভোক্তাদের জন্য সরাসরি অতিরিক্ত কোনো সুবিধা তৈরি হবে না।ক্যানসার প্রতিরোধী ওষুধের শুল্ক সুবিধা প্রসঙ্গে মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান বলেন, এসব ওষুধের ক্ষেত্রে আগে থেকেই শুল্ক সুবিধা থাকায় নতুন সিদ্ধান্তের ফলে ভোক্তা পর্যায়ে অতিরিক্ত মূল্যহ্রাস না-ও হতে পারে।তবে আগে কোনো ওষুধের ওপর শুল্ক আরোপিত থাকলে এবং নতুন সিদ্ধান্তে তা প্রত্যাহার করা হলে দাম কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে জানান তিনি।ওষুধশিল্পে ব্যবহৃত বায়োলজিক্যাল সেফটি ক্যাবিনেট আমদানিতে শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করায় এনবিআরকে ধন্যবাদ জানান মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান। তবে এ সিদ্ধান্তের ফলে ভোক্তা পর্যায়ে ওষুধের দাম কমবে কি না, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো মন্তব্য করেননি।