TAXNEWSBD
১৩৫ টাকার ডিজেলে শুল্ক-কর ৩৬ টাকা: সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধিতে মূল্যস্ফীতির আগুনে ঘি
শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৯:২৭ অপরাহ্ন
TAXNEWSBD

TAXNEWSBD

১৩৫ টাকা দামের প্রতি লিটার ডিজেলে সরকার শুল্ক ও কর বাবদ নিচ্ছে ৩৫ টাকা ৮২ পয়সা। সরকারের এই অতিরিক্ত রাজস্ব আহরণের খেসারত শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের ওপর অন্যায্যভাবে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে কি না তা নিয়ে উঠেছে তীব্র প্রশ্ন।জ্বালানির ওপর শুল্কের এই বিশাল বোঝা চাপানো শুরু হয় ২০২৫ সালের জুন মাস থেকে। ওই সময় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জ্বালানি আমদানিতে নির্দিষ্ট ট্যারিফ ভ্যালু ভিত্তিক কর ব্যবস্থার পরিবর্তে পরিবর্তনশীল ইনভয়েস ভ্যালু ব্যবস্থা চালু করে।আগের পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওঠানামা যাই হোক না কেন, লিটারপ্রতি মোট শুল্ক-কর সর্বোচ্চ ১৬ টাকা ৭৬ পয়সায় নির্ধারিত ছিল। কিন্তু বর্তমান কাঠামোয় আমদানিকৃত তেলের ইনভয়েস মূল্যের ওপর সরাসরি সর্বমোট ২৫ শতাংশ কর ধার্য করা হয় যার মধ্যে রয়েছে ৬ শতাংশ আমদানি শুল্ক, ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ২ শতাংশ আগাম কর এবং ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর।এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে, সরকারের লিটারপ্রতি কর আদায়ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেড়ে যায়। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী, আগের ট্যারিফ পদ্ধতির তুলনায় সরকার এখন প্রতি লিটারে ১৯ টাকা ৬ পয়সা অতিরিক্ত কর আদায় করছে।খুচরা জ্বালানির দাম সাম্প্রতিক বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত হয়ে এই বাড়তি করের বোঝা পরিবহন, সেচ এবং শিল্প উৎপাদনের খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে দিশেহারা সাধারণ মানুষের ওপর চাপ আরও তীব্র হচ্ছে।

মূল্যস্ফীতির আগুনে ঘি

ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, জ্বালানি খরচ বাড়লে তার প্রভাব খুব দ্রুত পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে।জ্বালানির চড়া দাম সেচ, পরিবহন ও পণ্য উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত সব ধরনের পণ্য ও সেবার দাম বাড়ায়। এতে সাধারণ পরিবারের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চরম আঘাত আসে। পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।রেস্তোরাঁ মালিকরা সম্প্রতি জানান, জ্বালানি ও উপকরণের দাম বাড়ায় তাদের মুনাফা অর্জনের সুযোগ কমে গেছে। অন্যদিকে বিক্রি ৩০ শতাংশ কমে যাওয়ায়, মেন্যুতে দাম বাড়িয়ে গ্রাহকের ওপর বাড়তি খরচ চাপিয়ে দেওয়াও তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।নীতি-নির্ধারকদের এই দ্বিমুখী সংকটের কথা তুলে ধরে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, "একদিকে সরকারের রাজস্ব বাড়াতে হবে এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) জমে থাকা লোকসান সামাল দিতে হবে। অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানির দাম বাড়লে, তা মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগে ফেলছে।

সরকার এই অতিরিক্ত শুল্ক-করের পুরো চাপ সাধারণ ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে কি না তা পুনর্বিবেচনা করার তাগিদ দেন তিনি। এমন পরিস্থিতিতে সরকার ভর্তুকি দিলে সর্বজনীন ভর্তুকির পরিবর্তে নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং কৃষকদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকির পরামর্শ দেন এই অর্থনীতিবিদ।কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম সরকারের এই কৌশলের সমালোচনা করে বলেন, বিশ্ববাজারে অস্থিতিশীলতার সময় অনেক দেশই অর্থনীতিকে সুরক্ষা দিতে জ্বালানির ওপর কর কমায়। কিন্তু বাংলাদেশে সরকার সংকটকে কাজে লাগিয়ে রাজস্ব বাড়িয়েছে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং দীর্ঘমেয়াদে মোট কর আদায় সংকুচিত করার ঝুঁকি তৈরি করছে।

বিপিসির আমদানি সংকট ও কর সংস্কারের প্রস্তাব

রাজস্ব আহরণের পদ্ধতি পরিবর্তনের ফলে, বিপিসির ওপরও সরাসরি আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। ইনভয়েস ভ্যালু ভিত্তিক বর্তমান কাঠামোয়, ১৩৫ টাকা খুচরা মূল্যের ডিজেল থেকে ৩৫ টাকা ৮২ পয়সা কর বাবদ কেটে নেওয়ায়, তেলের আমদানি খরচ মেটাতে বিপিসির কাছে নিজস্ব রাজস্ব সংস্থানের জায়গা কমে গেছে।গত ২৯ সেপ্টেম্বর চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিপিসি ইনভয়েস ভ্যালুতে শুল্ক-কর কমানো অথবা আগের ট্যারিফ ভ্যালু পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার সুপারিশ করেছে।

গত ২১ সেপ্টেম্বর সরকার সব ধরণের প্রধান পেট্রোলিয়াম পণ্যের দাম গড়ে ১৫ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্তের পর এই প্রস্তাব আসে। ওই সময় প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে ১৭.৪ শতাংশ বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছিল। পাশ্ববর্তী দেশে তেল পাচার রোধ এবং বিপিসির লোকসান কমানোর তাগিদে এই দাম বাড়ানো হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে এমন যুক্তি দেওয়া হলেও, মূলত মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ায় ২০২৬ সালের মার্চ থেকে আগস্টের মধ্যে বিপিসি ২২ হাজার ৮৭৫.৬৬ কোটি টাকার বিশাল পুঞ্জীভূত লোকসানের মুখ দেখেছে।টাকার অবমূল্যায়ন বিপিসির সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে: ২০২১ সালে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার যেখানে ৮৬ টাকা ছিল, সেখানে ২০২৬ সালে তা বেড়ে ১২৩ টাকা ৫০ পয়সায় পৌঁছেছে। এতে প্রতি লিটার ডিজেলের ল্যান্ডিং কস্টে (সার্বিক মূল্য) প্রায় ৫৫ টাকা যোগ হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে আমদানির বিল মেটাতে গিয়ে বিপিসি বাধ্য হয়ে তাদের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প তহবিল থেকে ১৯,৫০০ কোটি টাকা সরিয়ে এনেছে।বিপিসির পক্ষ থেকে শুল্ক-কর সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য জ্বালানি বিক্রি থেকে সংস্থার নিজস্ব আয়ের অংশ বাড়ানো।

সাময়িক অর্থায়নে দীর্ঘমেয়াদী সংস্কার স্থগিত

তবে গত ২৯ সেপ্টেম্বর সরকারের দেওয়া ৪,৫০০ কোটি টাকার সুদমুক্ত আর্থিক সহায়তার পর, শুল্ক সংস্কারের বিষয়ে বিপিসির তোড়জোর সাময়িকভাবে থমকে গেছে। অর্থ বিভাগ থেকে ৫ বছর মেয়াদি এবং ৬ মাসের গ্রেস পিরিয়ডসহ ঋণ হিসেবে দেওয়া এই অর্থে, আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত বিপিসির তেলের আমদানি দরপত্র কভার করা সম্ভব হবে।বিপিসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা স্বীকার করেন যে, মূলত বাড়তি শুল্ক-করের কারণে জ্বালানি তেলের দাম থেকে বিপিসির অংশ কমে গেছে। বর্তমানে ইনভয়েস ভ্যালুতে কর আদায় করার ফলে ডিজেলের ১৩৫ টাকা মূল্য থেকে সরকারকে ৩৫.৮২ টাকা শুল্ক দিতে হচ্ছে। আগের ট্যারিফ ভ্যালুতে আদায় করা হলে সরকারকে ১৬.৭৬ টাকা শুল্ক দিলেই হতো। তাতে প্রতি লিটার ডিজেলে বিপিসির হাতে ১৯ টাকা ৬ পয়সা অতিরিক্ত আসতো। এতে বিপিসির লোকসান কমতো এবং আমদানি ব্যয় মেটাতে টাকার ঘাটতি কম হতো। তবে নতুন এই ঋণ আপাতত তাদের নগদ অর্থের জরুরি সংকট মিটিয়েছে।বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন যে, শুল্ক সংক্রান্ত প্রস্তাব কমিটির ওয়ার্কিং পেপারে জমা দেওয়া হলেও জরুরি ঋণের সুবিধা পাওয়ায় এ বিষয়ে আর বিস্তারিত আলোচনা করা হয়নি।বিপিসির প্রস্তাবে দীর্ঘমেয়াদী কিছু পদক্ষেপের রূপরেখাও দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে রয়েছে একটি ডেডিকেটেড জাতীয় জ্বালানি স্থিতিশীলতা তহবিল (ফুয়েল স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড) গঠন, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্প ও ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ দ্রুত চালু করা এবং দেশের জাতীয় জ্বালানি মজুদ সক্ষমতা বাড়িয়ে ৯০ দিনে উন্নীত করা।আপাতত সরকারের নগদ অর্থের জোগান বিপিসিকে কিছুটা সময় এনে দিলেও, তাতে মূল সংকটের সমাধান হয়নি: যেখানে চরম অর্থনৈতিক চাপের এই সময়েও বর্তমান শুল্ক কাঠামোর মাধ্যমে সরকার সাধারণ ভোক্তাদের কাছ থেকে রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব আদায় করে যাচ্ছে।