TAXNEWSBD
নির্ধারিত সময়ের আগে জমায় কর ছাড়ের সুবিধা পেতে আয়কর রিটার্ন বেড়েছে ৭৭ শতাংশ
শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৯:১৯ অপরাহ্ন
TAXNEWSBD

TAXNEWSBD

নির্ধারিত সময়ের আগে আয়কর রিটার্ন জমা দিলে কর ছাড়ের সরকারি প্রণোদনার মুখে চলতি ২০২৬-২৭ করবর্ষের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের রিটার্ন জমা ১২.৫৩ লাখে পৌঁছেছে যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭৭ শতাংশ বেশি।জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্র জানায়, প্রায় ৩ লাখ করদাতা এই সুবিধা বা প্রণোদনা গ্রহণ করেছেন। এই ব্যবস্থার আওতায় প্রদেয় করের ওপর সর্বোচ্চ ২৫,০০০ টাকা পর্যন্ত ৫ শতাংশ ছাড় পাওয়া যায়, যা কর পরিশোধের সময় সরাসরি মোট কর দায় থেকে সমন্বয় করা হয়।নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা  বলেন, গত বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ৭.০৯ লাখ আয়কর রিটার্ন জমা হয়েছিল, যা চলতি বছরের একই সময়ে উল্লম্ফন করে ১২.৫৩ লাখে পৌঁছেছে।তিনি জানান, সরকার নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে রিটার্ন জমা দিয়ে প্রায় ৩ লাখ করদাতা এই কর ছাড়ের সুবিধা ভোগ করেছেন।

গত ২ আগস্ট এনবিআরের ঘোষিত এই প্রণোদনাভিত্তিক কাঠামোটি প্রথাগত নির্দিষ্ট সময়ের শেষসীমা থেকে সরে আসার এক নতুন পদক্ষেপ। নতুন এই ব্যবস্থার অধীনে যেসব ব্যক্তিশ্রেণির করদাতা ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দিয়েছেন, তারা ৫ শতাংশ ছাড়ের যোগ্য হয়েছেন। তবে ১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে জমা পড়া রিটার্নে কোনো ছাড় বা প্রণোদনা মিলবে না।অন্যদিকে বিলম্বিত আয়কর রিটার্ন জমার ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে: ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে প্রদেয় করের ২ শতাংশ বা ৩,০০০ টাকা (যেটি বেশি) জরিমানা গুণতে হবে। আর ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুনের মধ্যে জমা দিলে এই জরিমানার পরিমাণ বেড়ে প্রদেয় করের ৫ শতাংশ বা ৫,০০০ টাকা হবে।ক্ষুদ্র করদাতাদের জন্য এই ছাড় স্পষ্ট উৎসাহ হিসেবে কাজ করেছে। মোহাম্মদ ইসমাইল নামে এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ৩০ সেপ্টেম্বর তার রিটার্ন জমা দিয়ে ২০,০০০ টাকা কর দায়ের বিপরীতে প্রায় ১,০০০ টাকা ছাড় পান।তিনি বলেন, সরকার ছাড় ঘোষণা করায় আমি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দিতে উৎসাহী হয়েছিলাম। টাকার অংকটা ছোট হলেও বিষয়টি আমার জন্য আনন্দের ছিল।

প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও সুবিধাভোগীর সংখ্যা কম

আয়কর বিশেষজ্ঞরা এই নীতির দিকনির্দেশনাকে স্বাগত জানালেও, দেশের বিশাল করদাতা কাঠামোর তুলনায় সার্বিক সুবিধাভোগীর সংখ্যা বেশ কম বলে উল্লেখ করেছেন।কর বিশেষজ্ঞ ও এসএএমসি অ্যাডভাইজরি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া উল্লেখ করেন যে, ২০২৫-২৬ করবর্ষে প্রায় ৪৯ লাখ ই-টিনধারী তাদের রিটার্ন জমা দেন, যার মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ প্রায় ৩২ লাখ করদাতা আয়কর পরিশোধ করেছিলেন। এর অর্থ দাঁড়ায়, চলতি বছর প্রায় ৩২ লাখ করদাতার এই প্রণোদনা পাওয়ার সম্ভাবনা বা যোগ্যতা ছিল।টিবিএসকে তিনি বলেন, রিটার্ন জমার এই খাড়া বৃদ্ধি প্রমাণ করে যে নীতিটি সঠিক দিকে এগোচ্ছে। তবে যে সংখ্যক করদাতা বাস্তবে এই ছাড়ের সুবিধা নিয়েছেন, তা তুলনামূলকভাবে এখনো কম।

উৎসে কর ও অগ্রিম করের কাঠামোগত বাধা

সুবিধাভোগীর সংখ্যা কম হওয়ার পেছনে এই নতুন কাঠামোর একটি মৌলিক ত্রুটিকে দায়ী করেন বড়ুয়া। তিনি জানান, যেসব করদাতার কর উৎসে কর কর্তন (টিডিএস) বা অগ্রিম আয়করের (এআইটি) মাধ্যমে শুরুতেই সম্পূর্ণ পরিশোধ হয়ে যায়, তারা এই কর ছাড় পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী মোট কর রাজস্বের ৮৫ শতাংশেরও বেশি আসে উৎসে কর কর্তন ও এআইটির মাধ্যমে। অধিকাংশ করদাতা আগেই তাদের কর মেটানো শেষ করায়, আগাম রিটার্ন জমা দিয়ে তারা দৃশ্যমান কোনো সুবিধা পান না ফলে তাদের নির্দিষ্ট সময়ের আগে রিটার্ন জমার বাড়তি কোনো উৎসাহ থাকে না।কর সংগ্রহের পদ্ধতি যাই হোক না কেন, নিয়ম মেনে আগাম রিটার্ন জমা দেওয়া সব সুশাসন মেনে চলা করদাতাই যাতে সুবিধা পান, সেভাবে এই প্রণোদনা কাঠামোর পুনর্গঠন করার জন্য নীতি-নির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায়ও এর প্রতিফলন দেখা গেছে। নারায়ণগঞ্জের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ হিসাব কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, তার আয়কর প্রতি মাসে উৎসেই কেটে নেওয়া হয়।মামুন বলেন, যেহেতু আমার নতুন করে এই ছাড় দাবি করার সুযোগ নেই, তাই সেপ্টেম্বরের সময়সীমার আগে রিটার্ন জমা দেওয়ার বিষয়ে আমার বাড়তি কোনো আগ্রহ ছিল না।

ব্যবধান কমানোর উপায়

বাংলাদেশে নিবন্ধিত ১.৩ কোটি ই-টিনধারী এবং সক্রিয় রিটার্ন জমাকারীদের মধ্যকার দীর্ঘদিনের ব্যবধান দূর করতে দুটি কাঠামোগত বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন স্নেহাশীষ বড়ুয়া।তিনি বলেন, এই ব্যবধান কমাতে দ্বিমুখী পদক্ষেপ প্রয়োজন: প্রথমত, মাঠপর্যায়ে রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র (পিএসআর) জমার শর্ত আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করা; এবং দ্বিতীয়ত, অর্থ আইন ২০২৬-এর অধীনে চালুকৃত সিস্টেম ইন্টিগ্রেশনের মাধ্যমে করদাতাদের প্রকৃত আয় ও সম্পদ নজরদারি করে করের আওতা বাড়ানো।