পুরস্কার পাচ্ছে সর্বোচ্চ ভ্যাটদাতা ১২৯ প্রতিষ্ঠানসেরা ভ্যাটদাতার সম্মাননা দিচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডশুল্ক ও করের কারণে অসম প্রতিযোগিতায় পড়তে হচ্ছেআয়কর প্রদানের সক্ষম লোকের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ১৬ লাখকর-সংক্রান্ত জ্ঞান উদ্যোক্তার জন্য অপরিহার্য
No icon

৩৪ হাজার কোটি টাকার রপ্তানি আদেশ বাতিল

১৫ মাস ধরে ব্যবসা-বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এ খাতে প্রায় ৪০১ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বেশি রপ্তানির আদেশ বাতিল হয়েছে। করোনা মহামারিতে ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক (গার্মেন্ট) শিল্পে।
স্থানীয় মুদ্রায় এর অঙ্ক ৩৪ হাজার ১২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকার বেশি। এর মধ্যে করোনার প্রথমে ঢেউয়ে বাতিল হয়েছিল ৩৫০ কোটি ডলারের রপ্তানি আদেশ। দ্বিতীয় ঢেউয়ে বাতিল হয়েছে আরও প্রায় ৫০ কোটি ডলার। অতি সম্প্রতি আরও প্রায় দেড় কোটি ডলারের রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়েছে।

দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮৫ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। বছরে এর অঙ্ক গড়ে ৩ হাজার ২৬২ কোটি ডলার। যদিও করোনার প্রভাবে এ খাতের রপ্তানি আয় কমে গেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সার্বিক রপ্তানি আয়ে।

গত বছরের মার্চ থেকে বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে লকডাউন আরোপিত হয়। এতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বড় বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর শোরুম প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ক্রেতারা পোশাক রপ্তানির আদেশ বাতিল করে দিতে থাকে।

গত বছরের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত সময়ে প্রায় ৩৫০ কোটি ডলারের রপ্তানি আদেশ বাতিল করা হয়। গত বছরের এপ্রিলে রপ্তানি আয় কমে যায় ৮৩ শতাংশ। ১৫ জুলাই রপ্তানিকারকদের ৫টি সংগঠনের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেওয়া এক চিঠিতে বলা হয়, গত বছরের ২৬ মার্চ থেকে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত এক মাস কারখানা বন্ধ থাকার ফলে গত অর্থবছরের এপ্রিল থেকে জুন এ তিন মাসে রপ্তানি আয়ে ধস নেমেছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, গত বছরের মার্চে ১৮ দশমিক ২১ শতাংশ, এপ্রিলে প্রায় ৮৩ শতাংশ, মেতে সাড়ে ৬১ শতাংশ এবং জুনে আড়াই শতাংশ কমেছিল রপ্তানি আয়। জুলাই থেকে এ আয় সামান্য হারে বাড়তে থাকে।

গত মার্চে ১২ দশমিক ৫৯ শতাংশ, এপ্রিলে এসে রপ্তানি আয়ে রেকর্ড ৫০৩ শতাংশ, মে মাসে ১১২ শতাংশ এবং জুনে ১১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়। জুলাইয়ে প্রথম ১৪ দিনে পোশাক রপ্তানিতে আয় হয়েছে ১৬৭ কোটি ডলার। গড়ে প্রতিদিন হয়েছে ১২ কোটি ডলার। এটিও রেকর্ড আয়। গত বছরের জুলাইয়ে প্রতিদিন গড় আয় হয়েছিল ৯ কোটি ডলার।

রপ্তানিকারকদের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেওয়া চিঠিতে আরও বলা হয়, সরকারের প্রণোদনার সহায়তা নিয়ে করোনার ক্ষতি কটিয়ে উঠার জন্য যখন আপ্রাণ চেষ্টা করা হচ্ছিল, তখনই ২৩ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট সরকার ঘোষিত কঠোর বিধিনিষেধের আওতায় ১৪ দিন রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানাগুলো বন্ধ রাখা হয়। এর সঙ্গে ঈদের ছুটি ৩ দিন। ফিরে আসতে আরও ২-৩ দিন। সব মিলে মোট ১৯-২০ দিন কারখানা বন্ধ রাখতে হবে। ২০ দিন কারখানা বন্ধ থাকলে এক মাসের রপ্তানি শিডিউল গড়বড় হয়ে পড়ে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ৬ মাসের রপ্তানি আয়ে।

উদ্যোক্তারা বলেছেন, করোনার নিয়ন্ত্রণ করতে এখন আর লকডাউনের নামে যাতে কারখানা বন্ধ রাখতে বাধ্য করা না হয় সেই নিশ্চয়তা তারা চান। করোনাকে টিকা বা অন্য কোনো উপায়ে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ রেখে করোনাকে নিয়ন্ত্রণ করলে দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়া কঠিন হবে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন বলেন, চলমান লকডাউনে বস্ত্র খাতের শিল্প মালিকরা উভয় সংকটে পড়েছেন। রপ্তানি আদেশ আছে, কিন্তু কারখানা বন্ধ থাকায় তা সময়মতো ডেলিভারি দেওয়া যাবে না। এতে অর্ডার বাতিলের আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে শ্রমিকদের বেতন, বন্দর ও গ্যাস-বিদ্যুৎ বিলের জরিমানার ক্ষতি তো আছেই।

তিনি প্রশ্ন করে বলেন, কারখানা না চললে রপ্তানি হবে না। রপ্তানি না হলে টাকা আসবে না। তখন মালিকরা বেতন দেবেন কোত্থেকে? তাই ১ আগস্ট রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানা খুলে দেওয়া উচিত। পণ্য রপ্তানি করতে পারলে অন্তত শ্রমিকদের বেতন দেওয়া যাবে। পাশাপাশি বন্দরে সৃষ্ট জট খুলে যাবে। এতে অর্থনীতির বহুমুখী উপকার হবে।

 ১৩ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে কঠোর বিধিনিষেধের সময় সব ধরনের শিল্পকারখানা বন্ধ থাকার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের পোশাক ক্রেতাদের ঢাকা অফিস থেকে দ্রুত তাদের প্রধান কার্যালয়কে অবহিত করে। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন ক্রেতারা। তারা রপ্তানিকারকদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে। অনেকের অর্ডার অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

কারখানা বন্ধ থাকায় রপ্তানির আদেশ বাতিল, স্থগিত বা হাতছাড়া হওয়ার বিষয়ে গার্মেন্ট মালিকরা নিয়মিত বিজিএমইএ ও বিকেএমইএকে অবহিত করছেন। ইতোমধ্যে প্রায় দেড়শ কারখানার রপ্তানি আদেশ বাতিল বা স্থগিত হয়েছে।

এদিকে বিধিনিষেধের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে সৃষ্টি হয়েছে কনটেইনার জট। এতে রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আমদানি কম হওয়ায় কনটেইনার এসেছে কম। ফলে এখন রপ্তানি বাড়ায় খালি কনটেইনার পাওয়া যাচ্ছে না। এতে পণ্য রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে ঈদের আগে নৌ পরিবহণ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করে।

টাস্কফোর্সের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঈদের ছুটিতে ২৪ ঘণ্টা বন্দর সচল রেখে সব পণ্য খালাস করে কনটেইনার ইয়ার্ড খালি করার কথা। এ জন্য বন্দর সংশ্লিষ্ট অফিসগুলোতে ২৪ ঘণ্টা কাজ চালানোর উপযোগী বাড়তি জনবল দেওয়া হয়। কিন্তু বিধিনিষেধের মধ্যে আমদানিকারকদের অফিস বন্ধ থাকায় তারা পণ্য খালাস করতে বন্দরে যেতে পারেননি। ফলে পণ্য খালাস হয়নি।

এতে আমদানি পণ্য বোঝাই কনটেইনারে ভরে গেছে ইয়ার্ড। এখন খালি কনটেইনার মিলছে না। ফলে পণ্যও রপ্তানি করা যাচ্ছে না। এতে বন্দরে রপ্তানি পণ্যেরও জট লেগে আছে। আমদানি করা কনটেইনারের মধ্যে ৩৫ শতাংশ তৈরি পোশাক খাতের। বাকি ৬৫ শতাংশ অন্য শিল্প ও বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের।

তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সহ-সভাপতি শহিদুল্লাহ আজিম বলেন, ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস দিয়ে ছুটি দেওয়া হয়েছে।

১৯-২০ দিন পর ৭-৮ আগস্ট কারখানা খোলার পরপরই জুলাই মাসের বেতনের সময় চলে আসবে। সবকিছু বন্ধ থাকায় রপ্তানি বিল সংগ্রহ করতে না পারায় মালিকদের কাছে টাকা নেই। এ অবস্থায় বেতন-ভাতা দিতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। যাতে ব্যাংকগুলো সহনীয়ভাবে রপ্তানি বিলের বিপরীতে আগাম দিতে পারে। এতে অন্তত শ্রমিকদের বেতন দেওয়া যাবে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, লকডাউনের ১৪ দিন ও ঈদের ৩ দিন ও সাপ্তাহিক ছুটিসহ ১৯-২০ দিন রপ্তানিমুখী শিল্প বন্ধ থাকার কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে কমপক্ষে ৬ মাস সময় লাগবে। যে ৬ মাসে সামনে এগিয়ে যেতাম। সে ৬ মাস ক্ষতি পুনরুদ্ধারের কাজ করতে হবে।

কারণ কারখানা বন্ধ থাকায় চলমান অর্ডারের কাজ সময়মতো শেষ করা সম্ভব হবে না। পারলেও পণ্য বিমানে রপ্তানি করতে হবে। এতে খরচ বহুগুণে বাড়বে। তিনি আরও বলেন, গার্মেন্ট কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে করোনা সংক্রমণের হার যৎসামান্য। কারণ শ্রমিকরা কারখানায় শৃঙ্খলা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে কাজ করেন। কোনো যুক্তির ভিত্তিতে রপ্তানিমুখী কারখানা বন্ধ রাখা হলো, তা বোধগম্য নয়। তারপরও সরকার যেহেতু শিল্পকারখানা বন্ধ রেখেছে ব্যবসায়ীরা সেই সিদ্ধান্তকে সম্মান করেছে।

উদ্যোক্তরা জানান, করোনার নেতিবাচক প্রভাব কাটিয়ে ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলো এখন স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু করে দিয়েছে। ভোক্তার ক্ষয় ক্ষমতা বাড়াতে ওইসব দেশের ব্যাংকগুলো ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে ঋণ সীমা বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে ওইসব দেশে এখন পোশাকের চাহিদা বেড়েছে। এ কারণে দেশে রপ্তানির আদেশও আসছে ব্যাপক। পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। ফলে করোনা শুরুর ১৫ মাসের মধ্যে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ঢেউ মোকাবিলা করে ভোক্তারা এখন চাহিদার দিকে নজর দিয়েছেন।